গাড়ির মাইলেজ বাড়ানোর উপায়: কম জ্বালানিতে বেশি দূরত্ব যাওয়ার সম্পূর্ণ গাইড

আগে এক লিটার অকটেনে আপনার গাড়ি যত কিলোমিটার চলত, এখন কি তার চেয়ে কম চলছে? একই দূরত্ব যেতে আগের তুলনায় বেশি জ্বালানি লাগছে? বাংলাদেশের অনেক গাড়িমালিকই এমন সমস্যার মুখোমুখি হন। বিশেষ করে ঢাকার যানজট, বারবার ব্রেক করা, ইঞ্জিনের যত্নে অবহেলা এবং ভুল গ্রেডের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহারের কারণে গাড়ির মাইলেজ কমে যেতে পারে।

অনেক সময় টায়ারের বাতাস কম থাকা বা ইঞ্জিনের ছোটখাটো সমস্যাও জ্বালানি খরচ বাড়িয়ে দেয়। তবে সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের মেরামতের প্রয়োজন হয় না। গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সঠিক ইঞ্জিন অয়েল নির্বাচন এবং চালানোর অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন এনে গাড়ির জ্বালানি খরচ কমানো সম্ভব। এতে ইঞ্জিনের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখার পাশাপাশি প্রতিদিনের যাতায়াত খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

গাড়ি কম জ্বালানিতে বেশি দূরত্ব যাওয়ার সম্পূর্ণ গাইড

এই ব্লগে গাড়ির মাইলেজ বাড়ানোর ১২টি কার্যকর উপায়, মাইলেজ কমে যাওয়ার কারণ, সঠিক ইঞ্জিন অয়েল নির্বাচন, মাইলেজ হিসাবের নিয়ম এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের ব্যবহারিক টিপস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

আজই যোগাযোগ করুন

গাড়ির মাইলেজ আসলে কী? মাইলেজ হিসাব করার নিয়ম

গাড়ির মাইলেজ বলতে প্রতি লিটার পেট্রোল, অকটেন বা ডিজেলে একটি গাড়ি কত কিলোমিটার চলতে পারে, তা বোঝায়। এই হিসাবকে জ্বালানি দক্ষতা (Fuel Economy) বলা হয়। গাড়ির মাইলেজ হিসাব করতে মোট অতিক্রান্ত দূরত্বকে ব্যবহৃত জ্বালানির পরিমাণ দিয়ে ভাগ করতে হয়। যেমন, একটি গাড়ি ১০ লিটার জ্বালানিতে ১২০ কিলোমিটার চললে তার মাইলেজ হবে ১২ কিলোমিটার প্রতি লিটার।

তবে মনে রাখবেন, ওডোমিটারে (Odometer) দেখানো গাড়ির মোট চলার দূরত্ব আর প্রতি লিটারে চলার দূরত্ব এক বিষয় নয়। গাড়ির মাইলেজ যত বেশি হবে, একই পরিমাণ জ্বালানিতে তত বেশি দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব হবে। তবে গাড়ির ইঞ্জিনের অবস্থা, রাস্তাঘাট, যানজট ও চালানোর অভ্যাসের ওপর মাইলেজ কমবেশি হতে পারে।

গাড়ির ইঞ্জিনের মাইলেজ বাড়ানোর ১২টি কার্যকর উপায়

গাড়ির মাইলেজ কমে গেলে জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়, যা মাস শেষে আপনার পকেটে বাড়তি চাপ তৈরি করে। তবে গাড়ি চালানোর অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে গাড়ির মাইলেজ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, গাড়ির তেল খরচ কমানোর ১২টি কার্যকর উপায়, যা আপনার গাড়ির জ্বালানি সাশ্রয়ে সাহায্য করবে।

১. গাড়ির জন্য সঠিক গ্রেডের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করুন

সঠিক গ্রেডের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করলে ইঞ্জিনের চলমান যন্ত্রাংশের মধ্যে ঘর্ষণ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ইঞ্জিন স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে। ভুল গ্রেডের অয়েল ব্যবহার করলে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ও জ্বালানি খরচে প্রভাব পড়তে পারে। তাই গাড়ির ম্যানুয়াল অনুযায়ী উপযুক্ত SAE গ্রেড ও মানের ইঞ্জিন অয়েল বেছে নিন।

২. নির্ধারিত সময়ে ইঞ্জিন অয়েল ও অয়েল ফিল্টার পরিবর্তন করুন

দীর্ঘদিন একই ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করলে সময়ের সঙ্গে এর কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি অয়েল ফিল্টারে অতিরিক্ত ময়লা জমলে ইঞ্জিনের লুব্রিকেশন ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই গাড়ির নির্মাতার নির্দেশনা অনুযায়ী ইঞ্জিন অয়েল ও অয়েল ফিল্টার পরিবর্তন করুন। এতে ইঞ্জিন ভালো রাখা এবং স্বাভাবিক জ্বালানি দক্ষতা বজায় রাখা সহজ হয়।

৩. গাড়ির টায়ারে সঠিক এয়ার প্রেশার বজায় রাখুন

টায়ারে বাতাস কম থাকলে রাস্তার সঙ্গে টায়ারের গড়ানোর প্রতিরোধ বেড়ে যায়। ফলে গাড়ি চালাতে ইঞ্জিনকে বেশি শক্তি খরচ করতে হয়, যা জ্বালানি খরচ বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত গাড়ির টায়ারের বাতাসের চাপ পরীক্ষা করুন এবং নির্মাতার নির্ধারিত মাত্রায় বাতাস রাখুন। অতিরিক্ত বাতাস দেওয়াও ঠিক নয়।

৪. এয়ার ফিল্টার ও স্পার্ক প্লাগ নিয়মিত পরীক্ষা করুন

গাড়ির ইঞ্জিনে জ্বালানি পোড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত বাতাস ও সঠিক ইগনিশন প্রয়োজন। স্পার্ক প্লাগে সমস্যা হলে জ্বালানি ঠিকমতো দহন না হওয়ায় ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা কমতে পারে। আবার এয়ার ফিল্টারে অতিরিক্ত ময়লা জমলে ইঞ্জিনের পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়তে পারে। তাই সার্ভিসিংয়ের সময় এয়ার ফিল্টার ও স্পার্ক প্লাগ পরীক্ষা করান।

৫. হঠাৎ গতি বাড়ানো ও জোরে ব্রেক করা এড়িয়ে চলুন

বারবার হঠাৎ অ্যাক্সিলারেটর চাপলে ইঞ্জিনে জ্বালানির চাহিদা বেড়ে যায়। আবার অপ্রয়োজনে জোরে ব্রেক করলে গাড়ির গতি ধরে রাখতে খরচ হওয়া শক্তির অপচয় হয়। তাই সামনে রাস্তার অবস্থা বুঝে ধীরে গতি বাড়ান এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। নিয়ন্ত্রিত ড্রাইভিং অভ্যাস জ্বালানি সাশ্রয়ে সাহায্য করে।

৬. যানজটে অপ্রয়োজনে গাড়ির ইঞ্জিন চালু রাখবেন না

ঢাকার যানজটে অনেক সময় গাড়ি দীর্ঘক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। এ সময় ইঞ্জিন চালু থাকলে গাড়ি না চললেও জ্বালানি খরচ হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলে নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিস্থিতিতে ইঞ্জিন বন্ধ রাখতে পারেন। তবে চলন্ত অবস্থায় বা সাময়িক থামার সময় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমনভাবে ইঞ্জিন বন্ধ করবেন না।

৭. নিরাপদ ও স্থির গতিতে গাড়ি চালানোর অভ্যাস করুন

অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে বাতাসের প্রতিরোধ বেড়ে যায় এবং ইঞ্জিনকে বেশি শক্তি ব্যবহার করতে হয়। আবার বারবার গতি বাড়ানো ও কমানোর কারণেও জ্বালানি খরচ বাড়তে পারে। তাই রাস্তার অবস্থা ও নির্ধারিত গতিসীমা মেনে যথাসম্ভব স্থির গতিতে গাড়ি চালান। এটি গাড়ির মাইলেজ ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।

৮. সঠিক গিয়ার ও ইঞ্জিন RPM বজায় রাখুন

ভুল গিয়ারে গাড়ি চালালে ইঞ্জিনের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়তে পারে। বিশেষ করে ম্যানুয়াল গাড়িতে অতিরিক্ত RPM বা খুব কম RPM-এ বেশি চাপ দিয়ে চালানো জ্বালানি দক্ষতার জন্য ভালো নয়। তাই গাড়ির গতি অনুযায়ী উপযুক্ত গিয়ার ব্যবহার করুন। অটোমেটিক গাড়ির ক্ষেত্রেও অপ্রয়োজনীয় দ্রুত অ্যাক্সিলারেশন এড়িয়ে চলুন।

৯. গাড়ির ইঞ্জিন ও ফুয়েল সিস্টেমের ত্রুটি পরীক্ষা করুন

ফুয়েল ইনজেক্টর, অক্সিজেন সেন্সর বা ইগনিশন সিস্টেমে সমস্যা হলে ইঞ্জিনের জ্বালানি ব্যবহারে প্রভাব পড়তে পারে। অনেক সময় এসব সমস্যার কারণে গাড়ির মাইলেজ হঠাৎ কমে যায়। ইঞ্জিনে অস্বাভাবিক কম্পন, শক্তি কমে যাওয়া বা Check Engine Light জ্বললে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ মেকানিক দিয়ে পরীক্ষা করান।

১০. গাড়ির এসি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করুন

গাড়ির এসি চালানোর জন্য ইঞ্জিন বা গাড়ির পাওয়ার সিস্টেম থেকে বাড়তি শক্তি প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে গরম আবহাওয়া ও ধীরগতির যানজটে এসির ব্যবহার জ্বালানি খরচ বাড়াতে পারে। গাড়ির এসি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করুন এবং এসি সিস্টেম নিয়মিত পরীক্ষা করান। এসি ব্যবহারে বাড়তি জ্বালানি খরচ হতে পারে। তবে শুধু মাইলেজ বাড়ানোর জন্য গরমে অস্বস্তিকর অবস্থায় গাড়ি চালানোর প্রয়োজন নেই।

১১. গাড়ির অতিরিক্ত ওজন কমান ও যাতায়াতের রুট পরিকল্পনা করুন

গাড়িতে অপ্রয়োজনীয় ভারী জিনিস রাখলে সেই বাড়তি ওজন বহন করতে ইঞ্জিনকে বেশি শক্তি খরচ করতে হয়। তাই প্রতিদিনের যাতায়াতে প্রয়োজন নেই এমন মালামাল গাড়ি থেকে সরিয়ে রাখুন। পাশাপাশি বের হওয়ার আগে রাস্তার যানজট ও বিকল্প রুট দেখে নিন। এতে অপ্রয়োজনীয় ঘোরাঘুরি ও জ্বালানি অপচয় কমানো সম্ভব।

১২. মানসম্মত জ্বালানি ব্যবহার করুন ও নিয়মিত গাড়ি সার্ভিসিং করান

গাড়ির নির্মাতার নির্ধারিত মানের জ্বালানি ব্যবহার করা জরুরি। তাই নির্ভরযোগ্য ফিলিং স্টেশন থেকে গাড়ির নির্মাতার নির্ধারিত মানের পেট্রোল, অকটেন বা ডিজেল নিন। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে ইঞ্জিন, ব্রেক, টায়ার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরীক্ষা করান। নিয়মিত গাড়ি সার্ভিসিং ইঞ্জিনের সমস্যা আগেই শনাক্ত করতে এবং স্বাভাবিক মাইলেজ বজায় রাখতে সাহায্য করে।

মানসম্মত জ্বালানি ব্যবহার করুন

গাড়ির মাইলেজ কমে যাওয়ার প্রধান ৬ টি কারণ

গাড়ির মাইলেজ হঠাৎ কমে গেলে শুধু জ্বালানির মানকে দায়ী করা ঠিক নয়। ইঞ্জিনের সমস্যা, অনিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, রাস্তার অবস্থা এবং গাড়ি চালানোর অভ্যাসসহ বিভিন্ন কারণে গাড়ির তেল খরচ বেড়ে যেতে পারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক এর প্রধান ৬টি কারণ।

১. ভুল গ্রেডের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার

গাড়ির ইঞ্জিনের জন্য নির্ধারিত গ্রেডের পরিবর্তে অন্য গ্রেডের অয়েল ব্যবহার করলে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ও জ্বালানি খরচে প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘদিন ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন না করলেও এর কার্যকারিতা কমে যায়। তাই গাড়ির নির্মাতার নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিক গ্রেডের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করা জরুরি।

২. গাড়ির টায়ারে বাতাস কম থাকা

টায়ারে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বাতাস কম থাকলে রাস্তার সঙ্গে চাকার ঘূর্ণন প্রতিরোধ বেড়ে যায়। ফলে গাড়ি চালাতে ইঞ্জিনকে অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করতে হয়। এতে গাড়ির মাইলেজ কমে যায় এবং টায়ারও দ্রুত ক্ষয় হতে পারে।

৩. এয়ার ফিল্টার ও স্পার্ক প্লাগে সমস্যা

এয়ার ফিল্টারে অতিরিক্ত ময়লা জমলে ইঞ্জিনে বাতাস প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে ইঞ্জিনের শক্তি ও কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে জ্বালানি খরচও বেড়ে যেতে পারে। আবার স্পার্ক প্লাগ নষ্ট হলে জ্বালানি ঠিকমতো দহন হয় না। বিশেষ করে স্পার্ক প্লাগের সমস্যায় ইঞ্জিনের শক্তি কমার পাশাপাশি জ্বালানি খরচ বেড়ে যেতে পারে।

৪. ফুয়েল ইনজেক্টর ও ইঞ্জিন সেন্সরে ত্রুটি

ফুয়েল ইনজেক্টর ঠিকমতো কাজ না করলে ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে। একইভাবে অক্সিজেন সেন্সর বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেন্সরে ত্রুটি থাকলে ইঞ্জিনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হয়। ফলে গাড়ির তেল খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ইঞ্জিনের পারফরম্যান্সও কমতে পারে।

৫. অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো ও বারবার ব্রেক করা

হঠাৎ গতি বাড়ানো এবং ঘন ঘন ব্রেক করার অভ্যাস গাড়ির জ্বালানি খরচ বাড়ায়। বিশেষ করে বারবার দ্রুত অ্যাক্সিলারেটর চাপলে ইঞ্জিনে বেশি জ্বালানি প্রয়োজন হয়। তাই অনিয়ন্ত্রিত ড্রাইভিংয়ের কারণে ভালো অবস্থায় থাকা গাড়িরও মাইলেজ কমে যেতে পারে।

৬. যানজট, অতিরিক্ত এসি ব্যবহার ও ইঞ্জিন চালু রাখা

ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে যানজটের কারণে গাড়ি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও ইঞ্জিনে জ্বালানি খরচ হতে থাকে। এর সঙ্গে এসি চালু থাকলে ইঞ্জিনের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। ফলে একই পরিমাণ জ্বালানিতে গাড়ি তুলনামূলক কম দূরত্ব অতিক্রম করে।

সঠিক ইঞ্জিন অয়েল কিভাবে গাড়ির মাইলেজ বাড়াতে সাহায্য করে?

গাড়ির ইঞ্জিনের ভেতরে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ একসঙ্গে কাজ করে। ইঞ্জিন অয়েল এসব যন্ত্রাংশের মধ্যে ঘর্ষণ কমায় এবং ক্ষয় থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। ইঞ্জিন অয়েলের ঘনত্ব বা ভিসকোসিটি (Viscosity) এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অয়েল বেশি ঘন হলে ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ সচল রাখতে বাড়তি শক্তির প্রয়োজন হতে পারে, ফলে জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়।

আবার অয়েল অতিরিক্ত পাতলা হলে ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ঠিকমতো সুরক্ষা নাও পেতে পারে। তাই সঠিক ঘনত্বের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করলে ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ সহজে চলতে পারে এবং অতিরিক্ত ঘর্ষণ কমে। এতে ইঞ্জিনের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ও জ্বালানি দক্ষতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

গাড়ির মাইলেজ হঠাৎ কমে গেলে কোন অংশগুলো পরীক্ষা করবেন?

গাড়ির মাইলেজ হঠাৎ কমে গেলে ইঞ্জিনের কোনো যন্ত্রাংশে সমস্যা আছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। অনেক সময় ছোটখাটো ত্রুটির কারণেও গাড়ির জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়। নিচের ছক থেকে জেনে নিন, কোন সমস্যায় গাড়ির কোন অংশ পরীক্ষা করা উচিত।

গাড়ির সমস্যা বা লক্ষণ সম্ভাব্য কারণ কী পরীক্ষা করবেন?
হঠাৎ মাইলেজ কমে যাওয়া টায়ারের বাতাস কম, ইঞ্জিন বা জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা টায়ার প্রেশার, ইঞ্জিন অয়েল ও ফুয়েল সিস্টেম পরীক্ষা করুন।
ইঞ্জিনে অতিরিক্ত কম্পন স্পার্ক প্লাগ বা ইগনিশন সিস্টেমে ত্রুটি স্পার্ক প্লাগ, ইগনিশন কয়েল ও ইঞ্জিনের অবস্থা পরীক্ষা করান।
গাড়ির গতি ও শক্তি কমে যাওয়া এয়ার ফিল্টার, ফুয়েল ইনজেক্টর বা ব্রেকে সমস্যা এয়ার ফিল্টার, ফুয়েল সিস্টেম ও ব্রেক পরীক্ষা করুন।
ইঞ্জিনের সতর্কতামূলক বাতি (Check Engine Light) জ্বলে ওঠা অক্সিজেন সেন্সর বা ইঞ্জিনের অন্য কোনো অংশে ত্রুটি OBD স্ক্যানের মাধ্যমে সমস্যার কারণ শনাক্ত করুন।
ইঞ্জিন অয়েল দ্রুত কমে যাওয়া অয়েল লিকেজ বা ইঞ্জিনের ভেতরে অস্বাভাবিক হারে অয়েল পুড়ে যাওয়া ইঞ্জিনের অয়েল লেভেল, লিকেজ ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করান।
গাড়ি চালানোর সময় পোড়া গন্ধ আসা ব্রেক আটকে থাকা বা ইঞ্জিনের কোনো অংশ অতিরিক্ত গরম হওয়া নিরাপদ স্থানে গাড়ি থামিয়ে ব্রেক ও ইঞ্জিনের অবস্থা পরীক্ষা করান।
বি.দ্র.: এসব লক্ষণ দেখা দিলে শুধু ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করবেন না। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ মেকানিকের সাহায্যে গাড়ির ত্রুটি শনাক্ত করে মেরামত করুন।

ঢাকার যানজটে গাড়ির তেল খরচ কমানোর বিশেষ টিপস

ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় যানজটের কারণে গাড়ি বারবার থামাতে হয়, আবার অল্প দূরত্ব পরপর গতি বাড়াতে হয়। এতে ইঞ্জিনে বেশি জ্বালানি খরচ হয় এবং গাড়ির মাইলেজ কমে যেতে পারে। তবে কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে যানজটের মধ্যেও গাড়ির তেল খরচ কমানো সম্ভব।

  • হঠাৎ গতি বাড়ানো এড়িয়ে চলুন: যানজটে সামনের গাড়ির সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব রেখে ধীরে গতি বাড়ান এবং অপ্রয়োজনে ব্রেক করা কমান।
  • দীর্ঘক্ষণ ইঞ্জিন চালু রাখবেন না: যানজটে অনেকক্ষণ থেমে থাকতে হলে নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিস্থিতিতে ইঞ্জিন বন্ধ রাখুন।
  • এসি ব্যবহারে সচেতন থাকুন: প্রয়োজন অনুযায়ী এসির তাপমাত্রা ঠিক রাখুন এবং গাড়ির এসি সিস্টেম নিয়মিত পরীক্ষা করান।
  • যানজট এড়িয়ে রুট নির্বাচন করুন: বের হওয়ার আগে গুগল ম্যাপে রাস্তার অবস্থা দেখে তুলনামূলক কম যানজটের পথ বেছে নিন।
  • অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার কমান: কাছাকাছি কয়েকটি কাজ থাকলে আলাদা আলাদা যাত্রার পরিবর্তে একবারেই সেরে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
  • গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করুন: ইঞ্জিন অয়েল, টায়ার প্রেশার ও ব্রেক ঠিক রাখুন, যাতে যানজটেও গাড়ির জ্বালানি দক্ষতা বজায় থাকে।

গাড়ির মাইলেজ বাড়ানো নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

গাড়ির মাইলেজ বাড়ানোর উপায় নিয়ে অনেকের মধ্যেই কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। এসব ধারণা মেনে চললে জ্বালানি সাশ্রয়ের পরিবর্তে খরচ বেড়ে যেতে পারে, এমনকি ইঞ্জিনের ক্ষতিও হতে পারে। তাই মাইলেজ বাড়ানোর আগে কোন তথ্যটি সঠিক, তা জেনে নেওয়া জরুরি।

প্রচলিত ধারণা বাস্তব তথ্য
বেশি ঘন ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করলে মাইলেজ বাড়ে। অতিরিক্ত ঘন অয়েল ব্যবহারে ইঞ্জিনের ভেতরে প্রতিরোধ বাড়তে পারে। তাই গাড়ির নির্মাতার নির্ধারিত গ্রেডের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করা উচিত।
বেশি অকটেনযুক্ত জ্বালানি ব্যবহার করলেই মাইলেজ বাড়বে। বেশি অকটেন মানেই বেশি মাইলেজ নয়। গাড়ির ইঞ্জিনের জন্য নির্ধারিত অকটেন রেটিং অনুযায়ী জ্বালানি ব্যবহার করাই ভালো।
টায়ারে বেশি বাতাস দিলে জ্বালানি খরচ কমে। অতিরিক্ত বাতাস দিলে টায়ারের গ্রিপ কমে যেতে পারে এবং অসমভাবে ক্ষয় হতে পারে। তাই নির্ধারিত মাত্রায় টায়ার প্রেশার রাখা জরুরি।
দামি ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করলেই মাইলেজ বাড়বে। শুধু দাম বেশি হলেই ইঞ্জিন অয়েল ভালো হবে, এমন নয়। সঠিক SAE গ্রেড, API মান ও গাড়ির ইঞ্জিনের উপযোগিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফুয়েল অ্যাডিটিভ ব্যবহার করলেই মাইলেজ বেড়ে যায়। সব ফুয়েল অ্যাডিটিভ জ্বালানি সাশ্রয়ে কার্যকর নয়। কিছু পণ্যের দাবি প্রমাণিত নয়, আবার অনুপযুক্ত অ্যাডিটিভ ইঞ্জিনের ক্ষতি করতে পারে।
এসি বন্ধ রাখলেই সব অবস্থায় মাইলেজ বাড়ে। এসি চালালে জ্বালানি খরচ বাড়তে পারে। তবে বেশি গতিতে জানালা খোলা রাখলেও বাতাসের বাধা বাড়ে, যা জ্বালানি দক্ষতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

গাড়ির জন্য সঠিক ইঞ্জিন অয়েল কীভাবে নির্বাচন করবেন?

গাড়ির ইঞ্জিন ভালো রাখা এবং জ্বালানি দক্ষতা বজায় রাখতে সঠিক ইঞ্জিন অয়েল নির্বাচন করা জরুরি। তবে সব ধরনের ইঞ্জিন অয়েল সব গাড়ির জন্য উপযুক্ত নয়। তাই অয়েল কেনার আগে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন।

  • গাড়ির ম্যানুয়াল অনুসরণ করুন: নির্মাতার নির্দেশনা অনুযায়ী ইঞ্জিনের জন্য নির্ধারিত গ্রেড ও মানের অয়েল বেছে নিন।
  • সঠিক SAE গ্রেড নির্বাচন করুন: গাড়ির উপযোগী 0W-20, 5W-30 বা 10W-40-এর মতো নির্ধারিত ভিসকোসিটি গ্রেড ব্যবহার করুন।
  • API মান যাচাই করুন: ইঞ্জিনের ধরন ও নির্মাতার চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত API পারফরম্যান্স মানের অয়েল নির্বাচন করুন।
  • ইঞ্জিনের বয়স ও অবস্থা বিবেচনা করুন: বেশি কিলোমিটার চলা গাড়ির ইঞ্জিনের অবস্থা পরীক্ষা করে উপযুক্ত অয়েল বেছে নিন।
  • ড্রাইভিং পরিস্থিতি খেয়াল রাখুন: ঢাকার যানজট, গরম আবহাওয়া ও নিয়মিত গাড়ি ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী নির্মাতার অনুমোদিত অয়েল ব্যবহার করুন।
  • বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের ইঞ্জিন অয়েল কিনুন: আসল পণ্য, সঠিক স্পেসিফিকেশন ও নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা যাচাই করে ইঞ্জিন অয়েল সংগ্রহ করুন।

গাড়ির মাইলেজ ধরে রাখতে বেছে নিন সঠিক ইঞ্জিন অয়েল

গাড়ির ইঞ্জিন ভালো রাখা এবং জ্বালানি দক্ষতা বজায় রাখতে সঠিক ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করা জরুরি। বাংলাদেশের গাড়ি মালিকদের জন্য বিভিন্ন গ্রেডের মানসম্মত অটোমোটিভ ইঞ্জিন অয়েল সরবরাহ করে। আমাদের ইঞ্জিন অয়েল ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশের ঘর্ষণ ও ক্ষয় কমাতে এবং স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

Choose the right engine oil to maintain your vehicle's mileage.

আপনার গাড়ির ইঞ্জিনের ধরন ও নির্মাতার নির্দেশনা অনুযায়ী উপযুক্ত গ্রেডের অয়েল নির্বাচন করুন। সঠিক ইঞ্জিন অয়েল সম্পর্কে জানতে বা পণ্য সংগ্রহ করতে +88-01700-760430 নম্বরে আজই কল করুন।

সঠিক অয়েল বেছে নিন

গাড়ির মাইলেজ বাড়ানো সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন

গাড়ির মাইলেজ বাড়ানো ও জ্বালানি খরচ কমানো নিয়ে অনেক গাড়ি মালিকেরই কিছু সাধারণ প্রশ্ন থাকে। সঠিক ইঞ্জিন অয়েল নির্বাচন, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও মাইলেজ হিসাবসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

সঠিক গ্রেডের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করলে গাড়ির জ্বালানি দক্ষতা কিছুটা উন্নত হতে পারে। তবে শুধু অয়েল পরিবর্তন করলেই মাইলেজ বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ইঞ্জিনের অবস্থা, টায়ার প্রেশার ও গাড়ি চালানোর অভ্যাসও মাইলেজের ওপর প্রভাব ফেলে।

সব গাড়ির মাইলেজ এক রকম হয় না। গাড়ির মডেল, ইঞ্জিনের ক্ষমতা, জ্বালানির ধরন এবং রাস্তাঘাটের ওপর মাইলেজ নির্ভর করে। সাধারণত শহরের যানজটে গাড়ির মাইলেজ হাইওয়ের তুলনায় কম হয়। আপনার গাড়ির স্বাভাবিক মাইলেজ জানতে নির্মাতার দেওয়া তথ্য ও নিজের জ্বালানি খরচের হিসাব মিলিয়ে দেখুন।

হ্যাঁ, গাড়ির এসি চালালে বাড়তি শক্তির প্রয়োজন হয়, ফলে জ্বালানি খরচ কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ঢাকার যানজট ও গরম আবহাওয়ায় এর প্রভাব বেশি বোঝা যায়। তবে এসি ব্যবহারের কারণে ঠিক কতটা তেল বেশি খরচ হবে, তা গাড়ির মডেল ও চালানোর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

হ্যাঁ, টায়ারে বাতাস কম থাকলে চাকার ঘূর্ণন প্রতিরোধ বেড়ে যায়। ফলে গাড়ি চালাতে ইঞ্জিনকে বেশি শক্তি খরচ করতে হয় এবং মাইলেজ কমে যেতে পারে। তাই জ্বালানি খরচ কমাতে গাড়ির নির্মাতার নির্ধারিত মাত্রায় টায়ার প্রেশার বজায় রাখুন।

পুরোনো গাড়ির মাইলেজ কমে যাওয়ার কারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় মেরামত করলে অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি দক্ষতা উন্নত করা সম্ভব। এ জন্য ইঞ্জিন, স্পার্ক প্লাগ, ফুয়েল সিস্টেম ও টায়ারের অবস্থা পরীক্ষা করা জরুরি। তবে ইঞ্জিনের অতিরিক্ত ক্ষয় থাকলে শুধু নিয়মিত সার্ভিসিং করে আগের মাইলেজ ফিরে পাওয়া নাও যেতে পারে।

ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তনের সময় গাড়ির মডেল, অয়েলের ধরন ও ব্যবহারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। সব গাড়ির জন্য একই পরিবর্তনের সময়সীমা প্রযোজ্য নয়। তাই গাড়ির ম্যানুয়ালে উল্লেখিত কিলোমিটার বা সময়ের সীমা অনুযায়ী ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন করুন। ঢাকার যানজটে নিয়মিত গাড়ি চালালে নির্মাতার বিশেষ রক্ষণাবেক্ষণ নির্দেশনাও অনুসরণ করুন।